সর্ববিদ্যার মূলে যোগবিদ্যা | সকল ধর্মে যোগদর্শণ
সর্ববিদ্যারমূলে যোগবিদ্যা | সকল ধর্মে যোগদর্শণ
সর্ব বিদ্যার মূল যোগ বিদ্যা, কারণ গভীর একাগ্রতা থেকেই সব কিছু জন্ম নেয়। কখনো নীরব ধ্যানে, কখনো শরীরচর্চার মত সরব কর্মে - মন এক হলে আবিষ্কার আসে।
যোগই হলো সকল বিদ্যার প্রথম ঘর। আসুন বিস্তারিত জানি কিভাবে সর্ববিদ্যার মূলে যোগবিদ্যা ও সকল ধর্মে যোগদর্শণ স্থিতি।
১. গভীর যোগের নীরবতা ও সরবতা
যোগ মানে শুধু চোখ বন্ধ করে বসে থাকা নয়। যোগ মানে ব্যালেন্সে থাকা, নিজের ভেতরের সেই বিশুদ্ধ বাস্তবতাটাকে আবিষ্কার করা।সাধারন দৃষ্টি দুটোই এর রূপ।
এক - নীরব যোগ। যখন একজন বিজ্ঞানী ল্যাবে চুপচাপ একটা সূত্রের দিকে তাকিয়ে থাকেন, যখন একজন ঋষি ধ্যানে থাকেন, যখন হেরা গুহায় মহানবী তাহান্নুথে ছিলেন, যেমন বুদ্ধ দেবের বুদ্ধত্ব - নীরব যোগ। সেই নীরবতা থেকেই ভেতরের আত্মউন্মোচনের দুয়ার উন্মোচিত হয়।
দুই - সরব যোগ। যখন একজন কুংফু শিল্পী নিখুঁত ব্যালেন্সে রণপ্রণালীর চর্চা করেন, যখন একজন সংগীত শিল্পী ছন্দ সৃষ্টি করেন, যখন একজন নৃত্যশিল্পী তালে পা ফেলেন - সবজায়গায় মন, শ্বাস ও শরীর এক বিন্দুতে যুক্ত। সেটা সরব যোগ। কুংফু শব্দের অর্থ দীর্ঘ সময় ধরে কোন নির্দিষ্ট কিছু চর্চার দ্বারা দক্ষতা অর্জন করা।
কিন্তু প্রায়শই বিখ্যাত যোগীদের মেডিটেশনের শিথিল শান্ত প্রক্রিয়ার প্রচার প্রসারই নজরে পড়ে। যোগ শুধুমাত্র শিথিলায়নের মত কোন বিশেষ দর্শনে সীমাবদ্ধ নয় বরং যোগ সমস্ত ক্রিয়ায় এক বিশেষ সমন্বয়। গীতায় বলা হয়েছে - যোগস্থং কুরু কর্মাণি - যুক্ত থেকেই কাজ করো।
২. শ্রেষ্ঠ আবিষ্কারসমূহ যোগ থেকেই
পৃথিবীর সব বড় আবিষ্কার কিন্তু গভীর যোগ থেকেই এসেছে। আগুনের আবিষ্কার, চাকার আবিষ্কার - সভ্যতা বিবর্তনে মাইলফলক যোগ দ্বারাই তার রূপরেখার অংকন করেছে। বিদ্যুৎ, বিমান, ইন্টারনেট, চাঁদে যাওয়া - প্রতিটি আবিষ্কারের পেছনে বছরের পর বছর একাগ্র হয়ে লেগে থাকা।
ওপেনহাইমার ও তার দল যখন লস আলামোসে দিন-রাত একটাই চিন্তায় ডুবে ছিলেন - পরমাণুর ভেতর কী আছে? - সেটা ছিল গভীর যোগ। মন এক বিন্দুতে না থাকলে পরমাণুর ভেতরের শক্তি দেখা সম্ভব হতো না যদিও সৃষ্টির প্রারম্ভে যোগনিষ্ঠ ঋষিগণ তা অনায়াসে দেখতে সক্ষম হয়েছিলেন।
উপনিষদ বলছে - যোগাৎ জ্ঞানং প্রবর্ততে - যোগ থেকেই জ্ঞান আসে। সেই জ্ঞান দিয়ে প্রদীপও জ্বালানো যায়, আবার অন্য কিছুও। পার্থক্যটা যোগ হলো শক্তি, সেই শক্তি কীভাবে ব্যবহার হবে সেটা মানুষ ঠিক যোগে নয়, পার্থক্যটা মানুষের উদ্দেশ্যে।করে।
৩. সৃষ্টির পূর্বেও যোগ ছিল
ঋগ্বেদের নাসদীয় সূক্তে বলা হয়েছে - সৃষ্টির পূর্বে না দিন ছিল, না রাত। তখন ছিলেন এক, তিনি তপে ছিলেন। মন্ত্রটি - তপসস্তন্মহিনা জায়তৈকম্ - সেই তপের তাপ থেকেই সব জন্ম নিল। সেই তপস্যাই আদি যোগ।
ভাগবতে বলা হয়েছে সৃষ্টিকর্তা যোগনিদ্রায় ছিলেন। সেই যোগনিদ্রা থেকেই সৃষ্টি। কুরআনে বলা হয়েছে আরশ ছিল পানির উপর, তিনি স্থির ছিলেন। বাইবেলে বলা হয়েছে ঈশ্বরের আত্মা জলের উপর ভাসছিলেন। সবাই একই স্থিরতার কথা বলছে। সেই স্থিরতাই যোগ।
৪. সব ধর্মের মূলে যোগের সম্পর্ক
প্রতিটি পথের শুরুতে যোগ রয়েছে। কারণ যোগ হলো সেই ব্যালেন্স, যার উপর দাঁড়িয়ে সব পথ বিস্তার লাভ করেছে।
সনাতন ধর্ম: এর কোনো শুরু সম্পর্কে জানা যায় না তাই একে সনাতন বলা হয়। সনাতন মানে চিরন্তন। ঈশ্বর স্বয়ং আদিযোগী বা প্রথম যোগী।
জৈন ধর্ম: প্রায় ৮০০০ বছর আগে, তাদের মূল সাধনা কায়োৎসর্গ - শরীরকে স্থির রাখা।
ইহুদি ধর্ম: প্রায় ২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে, তাদের মধ্যে কাব্বালাহ নামে ধ্যানের পরম্পরা আছে।
বৌদ্ধ ধর্ম: খ্রিস্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতাব্দীতে। বুদ্ধের বিপাসনা হলো নীরব যোগ, আর তার শিষ্যদের হাত ধরেই শাওলিন কুংফুর মতো সরব যোগের জন্ম।
খ্রিস্ট ধর্ম: ১ম শতাব্দীতে, তাদের মধ্যে কন্টেমপ্লেটিভ প্রেয়ার নামে নীরব যোগ আছে।
ইসলাম ধর্ম: ৬১০ খ্রিস্টাব্দে হেরা গুহার তাহান্নুথ - নির্জন ধ্যান থেকে। ইসলামে দুই যোগই আছে - মুরাকাবা আর নামাজ হলো যোগের রূপ। নামাজে কিয়ামে স্থির দাঁড়ানো, রুকুতে নত হওয়া, সিজদায় সমর্পণ, তাশাহহুদে স্থির বসা - প্রতিটি ভঙ্গি শরীরের ব্যালেন্স। আর খুশু হলো মনের ব্যালেন্স।
শিখ ধর্ম: ১৫শ শতাব্দীতে, তাদের নাম সিমরন হলো জপযোগ। দেখুন - পাত্র আলাদা, কিন্তু ভেতরের জল এক। সেই জলের নাম যোগ।
৫. শেষ কথা
বাঁশির মধ্যে ফাঁকা আছে বলেই সুর বের হয়।এই ফাঁকা স্থানটা হলো নীরবতা, আর সেই নিরবতা দিয়ে যে বাতাস বেরিয়ে সুর হয়, সেটা হলো সরবতা। দুটো মিলেই বাঁশির পূর্ণতা। জীবনও তেমনি - ভেতরে নীরবতাটুকু না থাকলে বাইরের কর্মে কোনো সুর আসে না।
আমরা সারাজীবন বাইরের আবিষ্কারের পেছনে ছুটি - কীভাবে আরও টাকা আসবে, আরও ভালো কিছু করা যাবে। কিন্তু আসল আবিষ্কারটা ভেতরের। ভেতরের আবিষ্কার হলো একটাই - আমি আমার মনকে এক জায়গায় রাখতে পারি। এই বোধটুকু আত্মস্থিরতা, তার জানার সব দরজা খুলে যায়।
স্থান আলাদা, কাজ আলাদা, কিন্তু ভেতরের যোগ একটাই। যোগ শুধুমাত্র , কোনো বিশেষ আসনের নাম নয়। যোগ হলো মানুষের সেই আদি ক্ষমতা, যেটা দিয়ে সে নিজেকে আবিষ্কার করে।
আর নিজেকে আবিষ্কার করলেই সে জগতকে আবিষ্কার করতে পারে। আগুন, চাকা, বিদ্যুৎ, বিমান, ইন্টারনেট থেকে শুরু করে পরমাণুর ভেতরের শক্তি - সবই সেই এক বিন্দুতে মন রাখার ফল। সেই জন্যই কথাটি আজও একই থাকে -
সর্ববিদ্যানাং জন্মবীজমূলং একা বিদ্যা - যোগবিদ্যা।
সর্ব বিদ্যার মূল যোগ বিদ্যা।
সৃজনশীল বিন্দুর নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url