রাজশাহী: উন্নয়নের কোপে হারিয়ে যাচ্ছে সবুজ
রাজশাহী: উন্নয়নের কোপে হারিয়ে যাচ্ছে সবুজ - একটি উত্তপ্ত ভবিষ্যতের পদধ্বনি
রাজশাহীতে সড়ক সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন প্রকল্পের নামে গত কয়েক বছরে ২৩ হাজারের বেশি বড় গাছ এবং ৯৭% পুকুর নিধন করা হয়েছে।
ভূমিকা:
রাজশাহী মানে আমরা জানি ছায়া সুনিবিড়, শান্ত, নির্মল বাতাসের নগরী। ভোরের আলোয় পদ্মার পাড়, দুপুরে গাছের ছায়ায় ঢাকা রাস্তা, বিকেলে পুকুর পাড়ে বটের ছায়া - এটাই ছিল রাজশাহীর চিরচেনা ছবি। দেশের সবচেয়ে কম দূষিত, সবুজ ও পরিচ্ছন্ন নগরী হিসেবে রাজশাহীর খ্যাতি ছিল বিশ্বজোড়া। রিকশায় যেতে যেতে মাথার উপর শতবর্ষী গাছের চাঁদোয়া, পাখির ডাক, পুকুরের হিমেল হাওয়া - এই ছিল রাজশাহীর প্রাণ। সেই সবুজ নগরী আজ হাঁপাচ্ছে। উন্নয়ন প্রকল্প আর সড়ক সম্প্রসারণের নামে নির্বিচার বৃক্ষনিধন শুরু হয়েছে, আর তারই প্রভাবে বদলে যাচ্ছে এই অঞ্চলের জলবায়ু, জীবন ও জীবিকা।
১. রাজশাহীতে গাছ কাটার বর্তমান চিত্র
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজশাহী জুড়ে গাছ কাটার যে মহোৎসব চলছে, তা কেবল কয়েকটি গাছ কাটা নয়, এটি একটি পরিকল্পিত সবুজ শূন্যতা তৈরির প্রক্রিয়া। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ কাশিয়াডাঙ্গা থেকে আমনুরা পর্যন্ত ৩৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়ক। এই সড়কের দুই ধারের অর্ধশতবর্ষী দুই হাজারেরও বেশি গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে শুধু রাস্তা চওড়া করার জন্য। স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক গাছ অকারণেই কাটা হচ্ছে, যেখানে বিকল্প নকশা করলেই বাঁচানো সম্ভব ছিল। এগুলো ২০ থেকে ৫০ বছর বয়সী ছায়াদায়ী মা-গাছ। একটি গাছ ৫০ বছর ধরে যে অক্সিজেন ও ছায়া দিয়েছে, তা নতুন চারার দিতে ৩০ বছর লাগবে। রাজশাহী-নওগাঁ ও রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহাসড়কেও একই চিত্র, সেখানে কাটা পড়েছে প্রায় ৫ হাজার গাছ। এই সড়কগুলো একসময় সবুজ টানেল নামে পরিচিত ছিল, এখন সেখানে প্রখর রোদে পথচারীদের হাঁটা কঠিন।
বিভিন্ন সরকারি তথ্য অনুযায়ী, শুধু রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনই কোনো পরিবেশগত সমীক্ষা ছাড়াই ২ হাজার ৬১৬টি বড় গাছ কেটেছে। সড়ক ও জনপথ, এলজিইডি, পানি উন্নয়ন বোর্ড, রেলওয়ে সহ বিভিন্ন সরকারি জমি থেকে সবচেয়ে বেশি গাছ কাটা হয়েছে রাজশাহী জেলাতেই - ২৩ হাজার ৪১টি। রেললাইনের দুই ধারের শিরীষ ও আকাশমণির সারি আজ আর নেই। পদ্মার বাঁধ রক্ষা প্রকল্পের নামেও কাটা পড়েছে শত শত গাছ, অথচ বাঁধের স্থায়িত্বের জন্য গাছই সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ। গাছের শিকড় মাটি আঁকড়ে ধরে রাখে, ভাঙন রোধ করে।
এর সাথে যোগ হয়েছে জলাশয় নিধন। একসময় রাজশাহী শহরে প্রায় ৪ হাজার পুকুর ও জলাশয় ছিল, এখন তা ২০০-এর নিচে নেমে এসেছে। গত এক দশকেই শহরের ৯৭ ভাগ পুকুর ভরাট হয়ে গেছে। গাছ এবং জলাশয় - তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের দুটি প্রাকৃতিক এসিই একসাথে ধ্বংস করা হচ্ছে। একটি পুকুর তার আশপাশের ২-৩ ডিগ্রি তাপমাত্রা কমিয়ে রাখে। পুকুর পাড়ের বট, তাল, নারকেল গাছ মিলে একটি মাইক্রো-ক্লাইমেট তৈরি করত। এখন পুকুর ভরাট করে সেখানে বহুতল ভবন ও মার্কেট উঠছে। রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী ধরমপুর, বোসপাড়া, সাগরপাড়া পুকুর সবই এখন দখল ও ভরাটের শিকার।
২. প্রভাব: তাপমাত্রা, বৃষ্টি ও জনস্বাস্থ্যে আঘাত
গাছ ও জলাশয় কমে যাওয়ায় পাঁচ দশকে রাজশাহী অঞ্চলে মৌসুমি বৃষ্টিপাত কমেছে প্রায় ৩৪%। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রতি বছর ২-৩ ফুট করে নিচে নেমে যাচ্ছে। পানির জন্য ৪২টি ইউনিয়নকে অতিসংকটাপন্ন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বরেন্দ্র অঞ্চল এমনিতেই খরা প্রবণ, এখন গাছ না থাকায় মাটি পানি ধরে রাখতে পারছে না। বৃষ্টি হলেও তা দ্রুত গড়িয়ে যাচ্ছে। ফলে ধানের জমিতে সেচের জন্য গভীর নলকূপের উপর নির্ভরতা বাড়ছে।
একটি বড় গাছ একটি ইকোসিস্টেম। নির্বিচারে গাছ কাটায় বাবুই, শালিক, টিয়া, কাঠঠোকরার মতো পাখি এবং মৌমাছির মতো পরাগায়নকারী প্রাণী আশ্রয় হারাচ্ছে। গাছ কমায় বাতাসে ধুলো বাড়ছে, PM2.5 এর মাত্রা শীতকালে দ্বিগুণ হচ্ছে। বাড়ছে হিটস্ট্রোক, শ্বাসকষ্ট, অ্যাজমা, ত্বকের রোগ। স্কুলের শিশুরা গাছের ছায়ায় বসতে পারে না, শ্রমিকরা দুপুরে বিশ্রামের জায়গা পায় না।
৩. ভবিষ্যৎবাণী: সামনে কী অপেক্ষা করছে?
আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা বলছে, নগরীর গড় তাপমাত্রা প্রতি দশকে ০.৪ থেকে ০.৬ ডিগ্রি হারে বাড়ছে। এই হারে চললে ২০৩০-৩৫ সালের মধ্যে গ্রীষ্মকালে রাজশাহীর তাপমাত্রা নিয়মিত ৪৫-৪৬ ডিগ্রি ছুঁবে। তখন দিনের বেলায় বাইরে কাজ করা অসম্ভব হবে। জাতিসংঘের মরুকরণ রোধ বিষয়ক কনভেনশনে রাজশাহীকে বাংলাদেশের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যদি এখনই পুকুর ও গাছ না বাঁচানো যায়, তাহলে আগামী ১৫ বছরে এই অঞ্চলে মরু-উদ্ভিদ ছাড়া কিছুই জন্মাবে না।
তাপমাত্রা বাড়লে রাজশাহীর বিখ্যাত আমের মুকুল তাপদাহে নষ্ট হবে। গবেষণা বলছে ৪০ ডিগ্রির বেশি তাপমাত্রায় আমের মুকুল ৩০% পর্যন্ত ঝরে যায়। লিচু, পেয়ারাতেও একই সমস্যা হবে। অতিরিক্ত গরমে শ্রমিকের কর্মঘণ্টা ও উৎপাদনশীলতা কমবে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের শ্রম উৎপাদনশীলতা ৮% কমে যেতে পারে, যার বড় ধাক্কা লাগবে রাজশাহীর মতো কৃষি নির্ভর অঞ্চলে।
৪. করণীয়: উন্নয়ন হোক, তবে প্রাণের বিনিময়ে নয়
রাজশাহীকে বাঁচাতে হলে শুধু গাছ লাগালেই হবে না, নীতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। এখানে ৮ দফা প্রস্তাব দেওয়া হলো:
১. গাছ বাঁচিয়ে বিকল্প নকশা বাধ্যতামূলক: প্রতিটি প্রকল্পে গাছের তালিকা করে কীভাবে গাছ বাঁচিয়ে প্রকল্প করা যায়, তার বিকল্প নকশা করতে হবে। রাস্তা ১০ ফুট বাঁকিয়ে দিলে যদি ৫০ বছরের গাছ বাঁচে, তাহলে সেই বাঁকই উন্নয়ন। পৃথিবীর অনেক দেশে গাছকে মাঝখানে রেখে ডিভাইডার করা হয়।
২. ১:১০ নীতি ও ৩ বছরের পরিচর্যা: একটি গাছ কাটলে দশটি দেশীয় প্রজাতির (নিম, বট, অর্জুন, আম, জাম, কদম, কৃষ্ণচূড়া) গাছ লাগানো এবং ৩ বছর পরিচর্যা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু লাগানো নয়, বাঁচাতে হবে।
৩. পরিবেশগত সমীক্ষা ও গণশুনানি: সরকারি প্রকল্পের গাছ কাটতেও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র এবং স্থানীয় জনগণের গণশুনানি বাধ্যতামূলক করতে হবে। জনগণ জানবে কেন গাছ কাটা হচ্ছে।
৪. পুকুর পুনরুদ্ধার আইন কঠোর করা: ভরাট হয়ে যাওয়া পুকুরগুলোকে দ্রুত উদ্ধার করে জলাশয় সংরক্ষণ আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। নতুন ভবনের নকশায় জলাধার রাখা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
৫. নগর বনায়ন ও রুফটপ গার্ডেন: শহরের প্রতিটি ফাঁকা জায়গা, রাস্তার মোড়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বাড়ির ছাদে বৃক্ষরোপণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। সিটি কর্পোরেশনকে এর জন্য আলাদা বাজেট এবং প্রণোদনা রাখতে হবে।
৬. দেশীয় প্রজাতিকে অগ্রাধিকার: বিদেশি ইউক্যালিপটাস বা আকাশমণি নয়, যেগুলো পানি বেশি খায়, সেগুলো বাদ দিয়ে নিম, বট, অশ্বত্থ, আম, জামের মতো ছায়া ও ফলদ দেশীয় গাছ লাগাতে হবে, যা পাখি ও মানুষ উভয়ের কাজে আসে।
৭. ওয়ার্ড ভিত্তিক বৃক্ষ রক্ষা কমিটি: প্রতিটি ওয়ার্ডে তরুণ, শিক্ষার্থী ও পরিবেশকর্মীদের নিয়ে বৃক্ষ রক্ষা কমিটি গঠন করতে হবে, যারা গাছ কাটা মনিটর করবে এবং নতুন গাছের পরিচর্যা করবে।
৮. আম ও কৃষি রক্ষায় বিশেষ পরিকল্পনা: তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে আমের মুকুল রক্ষায় কৃষি বিভাগকে হিট-রেজিস্ট্যান্ট জাত নিয়ে গবেষণা এবং কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। সেচের আধুনিক পদ্ধতি যেমন ড্রিপ ইরিগেশন চালু করতে হবে।
শেষ কথা:
গাছ তাপমাত্রা কমাতে, বায়ুমণ্ডল শীতল রাখতে কার্যকর ভূমিকা পালন করে - এটি এখন স্লোগান নয়, বেঁচে থাকার বিজ্ঞান। রাজশাহীকে যদি আমরা আবার সবুজ নগরী হিসেবে দেখতে চাই, তবে আজই কুড়াল থামাতে হবে, নইলে কাল এই শহর কেবল ইতিহাসের পাতায় সবুজ থাকবে, বাস্তবে থাকবে একটি উত্তপ্ত কংক্রিটের মরুভূমি।

সৃজনশীল বিন্দুর নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url