সাপ্লিমেন্ট কি স্টেরয়েড? জেনে নিন আসল পার্থক্য
সাপ্লিমেন্ট কি স্টেরয়েড? ৭টি পার্থক্য যা প্রতিটি জিম করা ছেলের জানা উচিত
বাংলাদেশে জিমে ভর্তি হওয়ার পর প্রায় সবার মনেই একটা কমন প্রশ্ন আসে, সাপ্লিমেন্ট কি স্টেরয়েড? পরিবারের লোক বলে প্রোটিন পাউডার খেলে কিডনি নষ্ট হবে, এটা স্টেরয়েড। আবার জিমের বড় ভাই বলে স্টেরয়েড নিলে এক মাসেই বডি হয়ে যাবে।
এই দুটো তথ্যই শুধু ভুল না, আপনার জীবনের জন্য বিপজ্জনক। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা একদম শূন্য থেকে বিজ্ঞানভিত্তিকভাবে বুঝবো সাপ্লিমেন্ট কি, স্টেরয়েড কি এবং কেন একটি খাবারের পরিপূরক আর অন্যটি হরমোনাল ড্রাগ।
সাপ্লিমেন্ট কি? কেন এটাকে খাবার বলা হয়?
সাপ্লিমেন্ট শব্দের অর্থ হলো পরিপূরক। ইংরেজিতে একে বলে Dietary Supplement। অর্থাৎ আমাদের প্রতিদিনের খাদ্যের পুষ্টির ঘাটতি পূরণ করে এমন কিছু। এটি কোনো ওষুধ নয়, এটি কোনো হরমোন নয়। এটা একটি সম্পূরক খাদ্যের মত। ধরুন আপনার মাসল বিল্ডিং এর জন্য প্রতিদিন ১৫০ গ্রাম প্রোটিন দরকার। আপনি মাছ, মাংস, ডিম, ডাল থেকে ১০০ গ্রাম পাচ্ছেন, বাকি ৫০ গ্রাম আপনি কোনোভাবেই খেতে পারছেন না। তখন Whey Protein সেই বাকি ৫০ গ্রাম পূরণ করে দেবে। সাপ্লিমেন্ট আমাদের শরীরের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে সাহায্য করে, কোনো নতুন প্রক্রিয়া তৈরি করে না এবং শরীরে কোনো অস্বাভাবিক হরমোন বাড়ায় না। তাই সঠিক ব্র্যান্ড এবং সঠিক ডোজে ভালো মানের সাপ্লিমেন্ট কখনোই আপনার শরীরের ক্ষতি করবে না বরং আপনার রিকভারি এবং পারফরম্যান্স উন্নত করবে।
Whey Protein বা Creatine কি স্টেরয়েড? ৯৯% মানুষ যে ভুলটা করে
বাংলাদেশে Protein মানুষ মনে করতে পারে whey protein বা creatine স্টেরয়েড। অনেক দোকানদার এবং জিমের ট্রেইনার পর্যন্ত বলে whey protein খেলে নাকি বডি ফুলে যায়, এটা স্টেরয়েড। এই কথাটা ১০০% ভুল।
Whey Protein কোনোভাবেই স্টেরয়েড না। এটি তৈরি হয় গরুর দুধ থেকে। আমরা যখন দুধ থেকে ছানা তৈরি করি, তখন যে হলুদ রঙের পানি বের হয় তাকে বলে whey। সেই whey কে ফিল্টার করে পাউডার বানানো হয়। অর্থাৎ এটি দুধেরই একটি অংশ, যেমন গুঁড়া দুধ।
অন্যদিকে স্টেরয়েড হলো ল্যাবে তৈরি কৃত্রিম টেস্টোস্টেরন হরমোন। এটি ইনজেকশন বা ট্যাবলেট আকারে শরীরে ঢোকে এবং সরাসরি হরমোন সিস্টেম নষ্ট করে দেয়। Whey Protein আপনার প্রোটিনের ঘাটতি পূরণ করে।
তাহলে কোনটা আমাদের জন্য ভালো হবে? আসল whey protein খেলে আপনি ১ মাসে ১০ কেজি গেইন করবেন না।তবে এটি আপনার গেইন ধীরে ধীরে ইনক্রিস করবে।আপনার মেজাজ ভালো রাখবে আর এটি এখন অনেক ভালো ফ্লেভারেও পাওয়া যায়।কোন ধরনের ফ্যাট বৃদ্ধি না করে লিন মাসল গেইনে সহায়ক।অনেকে ব্যাস্ততার কারনে পর্যাপ্ত পুষ্টি গ্রহনে ব্যার্থ হন এটি তাদের জন্য খুব ভালো এবং কম সময়ে ঝামেলাবিহীন প্রোটিনের উৎস।বিশেষ করে জিমের শেষ, পোস্ট ওয়ার্কআউট ড্রিংক হিসেবে এটি খুব জনপ্রিয়।
তাই whey protein কেনার সময় সবসময় স্ক্যানার দিয়ে অথেন্টিকেশন চেক করুন, Labdoor বা Informed Choice সিল দেখুন এবং বিশ্বস্ত শপ থেকে কিনুন। মনে রাখবেন, whey protein হলো খাবার, স্টেরয়েড হলো ড্রাগ। দুটো কখনোই এক না।
বাংলাদেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং নিরাপদ ৫টি সাপ্লিমেন্ট
১. Whey Protein: এটি গরুর দুধ থেকে তৈরি হয়। ছানা তৈরির সময় যে পানি বের হয় সেখান থেকে এই প্রোটিন আলাদা করা হয়। মাসল রিপেয়ার এবং গ্রোথের জন্য এটি এক নম্বর সাপ্লিমেন্ট। যারা ডায়েটে প্রোটিনের ঘাটতিতে আছেন তাদের জন্য আদর্শ। Isolate ফর্মে ল্যাকটোজ কম থাকে তাই হজমে সমস্যা হয় না।
২. Creatine Monohydrate: এটি আমাদের মাংসপেশিতেই প্রাকৃতিকভাবে থাকে। আমরা যখন ভারী ওজন তুলি তখন শরীর ATP নামক শক্তি ব্যবহার করে। ক্রিয়েটিন সেই ATP দ্রুত তৈরি করতে সাহায্য করে। ফলে আপনি ১ থেকে ২টা রেপ বেশি দিতে পারেন। পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি গবেষণা করা হয়েছে এই সাপ্লিমেন্ট নিয়ে এবং এটি অত্যন্ত নিরাপদ। প্রতিদিন ৩ থেকে ৫ গ্রাম যথেষ্ট।
৩. Fish Oil এবং Multivitamin: যারা জিম করেন তাদের শরীরে ওমেগা ৩ এবং ভিটামিন ডি এর ঘাটতি খুব সাধারণ। এটি জয়েন্ট পেইন কমায় এবং রিকভারি বাড়ায়। যাদের হাঁটুতে ব্যথা হয় তাদের জন্য খুব কার্যকরী।
৪. EAA বা Essential Amino Acid: এটি প্রোটিনের ক্ষুদ্রতম অংশ। শরীর যখন ক্লান্ত থাকে, লম্বা সময় ট্রেনিং করলে মাসল ভাঙন রোধ করে। ফাস্টেড ট্রেনিং যারা করেন তাদের জন্য ভালো।
৫. Mass Gainer: যারা অনেক রোগা এবং ওজন কোনোভাবেই বাড়ে না, তাদের জন্য কার্ব এবং প্রোটিনের ক্যালোরি ডেন্স মিশ্রণ। তবে এতে চিনির পরিমাণ বেশি থাকতে পারে তাই দেখে কিনতে হবে এবং ডায়াবেটিস থাকলে এড়িয়ে চলা ভালো।
স্টেরয়েড কি? কেন এটি ড্রাগ?
স্টেরয়েডের পুরো মেডিকেল নাম Anabolic Androgenic Steroids বা AAS। এটি হলো কৃত্রিমভাবে ল্যাবে তৈরি করা টেস্টোস্টেরন হরমোন। আমাদের শরীরে ছেলেদের অন্ডকোষে প্রাকৃতিকভাবে টেস্টোস্টেরন তৈরি হয়। এই হরমোনই মাসল তৈরি, দাড়ি গজানো এবং পুরুষালি বৈশিষ্ট্যের জন্য দায়ী। স্টেরয়েড যখন আপনি বাইরে থেকে ইনজেকশন বা ট্যাবলেট আকারে নেন, তখন রক্তে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ১০ থেকে ১০০ গুণ বেড়ে যায়। তখন শরীর পাগলের মতো দ্রুত প্রোটিন সংশ্লেষণ শুরু করে এবং মাসল ফুলতে শুরু করে। কিন্তু এখানেই আসল সমস্যা। শরীর যখন দেখে বাইরে থেকে এত হরমোন আসছে, তখন সে নিজের ভেতরের ফ্যাক্টরি বন্ধ করে দেয়। অর্থাৎ আপনার শরীর নিজে আর টেস্টোস্টেরন তৈরি করবে না। এই অবস্থাকে বলে Testosterone Shutdown। ডাক্তাররা স্টেরয়েড ব্যবহার করেন শুধুমাত্র বিশেষ রোগে, যেমন বয়স হয়ে গেলেও বয়ঃসন্ধি না হলে, ক্যান্সার বা এইডস রোগীর শরীরের মাংসপেশি ক্ষয় হয়ে গেলে। বডিবিল্ডিং এর জন্য ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ছাড়া এটি ব্যবহার করা বাংলাদেশ সহ বিশ্বের সব দেশে অবৈধ। জিমে যেসব নামে এটি বিক্রি হয় সেগুলো হলো Dianabol, Anadrol, Trenbolone, Deca Durabolin, Winstrol, Anavar। ওয়াল্ডের বিভিন্ন জিমে এগুলোকে ডাকা হয় গিয়ার, সাইকেল, হরমোন।
স্টেরয়েড সাইকেল এবং PCT কি?
জিমে যারা স্টেরয়েড নেয় তারা একে সাইকেল বলে। যেমন ৮ সপ্তাহের সাইকেল। সাইকেল শেষে শরীরের হরমোন একদম শূন্য হয়ে যায় এবং অন্যান্য পার্টসও ঝুঁকির শিকার হয়। তাই শরীরকে আবার আগের অবস্থায় ফেরাতে Post Cycle Therapy বা PCT করতে হয়। PCT এর ওষুধের দাম অনেক বেশি এবং অনেক সময় এটি কাজ করে না। তাই অনেকে সারা জীবনের জন্য TRT অর্থাৎ বাইরে থেকে টেস্টোস্টেরন নিতে বাধ্য হয়। এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং ঝুঁকিপূর্ণ।
সাপ্লিমেন্ট এবং স্টেরয়েডের মধ্যে ৭টি আসল পার্থক্য
| বিষয় | সাপ্লিমেন্ট (নিরাপদ) | স্টেরয়েড (বিপজ্জনক) |
|---|---|---|
| ১. মূল পরিচয় | খাবারের পরিপূরক | কৃত্রিম হরমোন / ড্রাগ |
| ২. উৎস | দুধ, মাংস, ভিটামিন থেকে তৈরি | ল্যাবে কেমিক্যাল দিয়ে তৈরি |
| ৩. কাজ করার নিয়ম | পুষ্টির ঘাটতি পূরণ করে | হরমোন সিস্টেম হ্যাক করে |
| ৪. ফলাফল | ধীরে কিন্তু স্থায়ী, | দ্রুত কিন্তু ঝুকিপূর্ণ , |
| ৫. পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া | সঠিক ডোজে নেই | লিভার, হার্ট, বন্ধ্যাত্ব |
| ৬. বৈধতা | সম্পূর্ণ বৈধ | প্রেসক্রিপশন ছাড়া অবৈধ |
| ৭. খরচ | ৩০০০ থেকে ১৫০০০ টাকা | ১৫০০০ থেকে ৪০০০০ টাকা + PCT |
স্টেরয়েডের ভয়াবহ সত্য
১. বন্ধ্যাত্ব: Testicular Atrophy হয়। স্পার্ম কাউন্ট শূন্য হয়ে যেতে পারে। অনেকে সারা জীবনের জন্য সন্তান জন্ম দেওয়ার ক্ষমতা হারান।
২. লিভার ও কিডনি ফেইলিওর: মুখে খাওয়ার Dianabol এবং Anadrol লিভারের জন্য সরাসরি বিষ।
৩. হার্ট অ্যাটাক: খারাপ কোলেস্টেরল LDL বাড়ায় এবং ভালো HDL কমায়। ২৫ থেকে ৩০ বছর বয়সে হার্ট অ্যাটাকের প্রধান কারণ।
৪. গাইনোকোমাস্টিয়া: অতিরিক্ত টেস্টোস্টেরন ইস্ট্রোজেনে কনভার্ট হয়ে ছেলেদের শরীরে নারীসুলভ পরিবর্তন আনে।
৫. Roid Rage: অতিরিক্ত রাগ, ডিপ্রেশন এবং আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ে।
বিগিনার হিসেবে কি করবেন?
যদি আপনি ন্যাচারালি সুন্দর বডি বানাতে চান তাহলে ৩টি ধাপ মেনে চলুন। ধাপ এক, খাবারকে গুরুত্ব দিন ৮০%। প্রতিদিন প্রতি কেজি ওজনের জন্য ১.৮ থেকে ২.২ গ্রাম প্রোটিন নিন। ধাপ দুই, সপ্তাহে ৪ দিন ওয়েট ট্রেনিং এবং ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুম। ধাপ তিন, শুধু Whey Protein Isolate এবং Creatine Monohydrate দিয়ে শুরু করুন। Labdoor Tested দেখে কিনবেন।
শেষ কথা
সাপ্লিমেন্ট হলো খাবার আর স্টেরয়েড হলো ড্রাগ। ন্যাচারাল বডিবিল্ডিং এ ধৈর্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ১ বছরে ৪ থেকে ৬ কেজি লিন মাসল বাড়াতে পারলে আপনার এফোর্ট ভালো। সিদ্ধান্ত আপনার।
Disclaimer: এই আর্টিকেলটি শুধু তথ্যের জন্য, মেডিকেল পরামর্শ নয়।

সৃজনশীল বিন্দুর নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url